ফ্ল্যাট - বাসা কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন
গুঁটি গুঁটি পায়ে হাঁটতে শিখা, প্রথম স্কুলে যাওয়া,বন্ধুদের প্রথমবার বাসায় বেড়াতে আসা, আমাদের জীবনের এমন ছোট-বড় সব মুহূর্তের সাক্ষীই হচ্ছে বাসা। বাসা আমাদের জীবনে শুধুমাত্র নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গাই না বরং বাসা আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়ারও জায়গা। তাই জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্তটা অন্যতম। যেহেতু ফ্ল্যাট কেনার বিষয়টার সাথে বৃহৎ বিনিয়োগের সম্পর্ক আছে তাই সেখানে ভুল করার কোন সুযোগ নেই।
আর সেইজন্যই আমরা নতুন ফ্ল্যাট কিনতে যাওয়ার আগে যে ব্যাপারগুলোর দিকে আপনার অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে সেই দিকগুলো আপনার সামনে তুলে ধরতে আমাদের এই আয়োজন-
১. আপনার প্রয়োজন সম্পর্কে জানুন
অনেক সময় ক্রেতারা তাদের প্রয়োজনটা বা পছন্দের বিষয়টা নিয়ে দ্বিধায় ভুগে। সাধারন ফ্ল্যাট, ডুপ্লেক্স নাকি কন্ডোমেনিয়াম এপার্টমেন্ট? কোন এলাকায় কিনবেন? ছোট নাকি বড় ফ্ল্যাট ? ২ বেডরুম নাকি ৩ বেডরুম ? এমন অনেক প্রশ্নই আপনাকে দিশাহারা করে দিতে পারে। তাই বাড়ি কেনার আগে বাড়িটি যে আপনার প্রয়োজনীয়তা ও জীবনযাত্রার ধরনের সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ সেই ব্যাপারেও অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিবেন।
২. বাজেট নির্ধারণ করুন
যেকোনো জিনিস কেনার ক্ষেত্রে আপনার বাজেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বাজেট হতে হবে আপনার চাওয়া আর সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । বাজেট একদম কাটায় কাটায় নির্দিষ্ট না করে কিছুটা বেশি রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আপনি চাইলে এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে কিছুটা ছাড়ের সুবিধা নিতে পারেন। আবার কিছু অর্থ পরিশোধ করে ইন্সটলমেন্টের সুবিধাও নিতে পারেন।আবার আপনি চাইলে ব্যাংক লোনের বিষয়েও বিবেচনা করতে পারেন। ব্যাংক লোনের ক্ষেত্রে আপনার ডাউনপেমেন্ট আর সুদের হার সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও ব্যাংক লোন পাওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর শর্তাবলি সম্পর্কেও জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
৩. স্থানীয় বাজার সম্পর্কে খোঁজ নিন
নির্দিষ্ট কোন বাড়ি কেনার বিষয়ে বিবেচনা করার আগে সেই এলাকার বাজার সম্পর্কে খোঁজ নিন এবং বিবেচনা করুন। এর পেছনে কারণ অনেকগুল ।
- আপনার পছন্দের এলাকায় বাড়ির দাম সম্পর্কে একটি ভাল ধারণা আপনি পাবেন ।
- কোন কারণে আপনার পছন্দ করা ফ্ল্যাটের দাম কম বা বেশি হলে তার কারণও আপনি বুঝতে পারবেন।
- বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৪. ফ্ল্যাটের আকার ও বেডরুমের সংখ্যা
ফ্ল্যাট ক্রয়ের বিনিয়োগ হচ্ছে স্থায়ী বিনিয়োগ । তাই বিনিয়োগের আগে ফ্ল্যাটের আকার ও বেডরুমের সংখ্যার বিষয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। বেডরুমের সংখ্যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা পয়েন্ট। ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন ফ্ল্যাটের বেডরুমের সংখ্যা ও আকার যেন আপনার প্রয়োজনকে পূরণ করতে পারে।
৫. আসবাবপত্রের পরিকল্পনা করুন
নতুন আসবাবপত্র আমরা রোজ কিনিনা। আমদের আসবাবপত্রগুলো নতুন বাসায় মানানসই হবে কিনা, এই ধরনের অনেক চিন্তাও আমাদের মধ্যে তৈরি হয়। সব ক্ষেত্রেই কয়েকটি সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করে আসবাবপত্র স্থাপনের বিষয়ে সিধান্ত নেওয়া যায়-
- আপনার আসবাব পরিমাপ করুন (উচ্চতা, দৈর্ঘ, প্রস্থ)
- পরিমাপ লিখুন
- ২টা গ্রাফ পেপারের টুকরো নিন
- একটি সিস্টেম স্থাপন করুন, অর্থাৎ প্রতি বর্গ = 1 ফুট ।
- একটা মার্কার ব্যবহার করে, গ্রাফ পেপারের প্রথম টুকরোতে প্রতিটি ঘরের মাত্রা আঁকুন। এটি করার জন্য আপনার ইউনিটের ফ্লোর প্ল্যানের প্রয়োজন হবে।
- আপনার আসবাবের মাত্রা গ্রাফ পেপারের দ্বিতীয় টুকরোতে আঁকুন।
- ফার্নিচারের টুকরো কেটে প্রথম গ্রাফ পেপারের টুকরোতে সেগুলি ফিট করে কিনা দেখুন। যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা অবশ্যই বেপারটা বিবেচনা করবেন। নিশ্চিত হয়ে নিন যে টেবিল চেয়ারগুলো টেনে আনার জন্য ও টেবিলের সাথে থাকা চেয়ারগুলোর চারিদিকে যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা সেই বিষয়ে। আপনি অনলাইনেও আপনার ফার্নিচারসহ বাসার নকশা তৈরি করতে পারবেন Room Styler ও Plan Your Room দিয়ে।
৬. তথ্য যাচাই করুন
বাড়ির বিষয়ে দেওয়া সমস্ত তথ্য সঠিক কিনা সেইটা আপনাকে যাচাই করে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে যেই বেপারগুলতে বিশেষভাবে খোঁজ নিতে হবে সেগুলো হল-
- জমির মালিকানা এবং জমির দখলদার সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।অর্থাৎ যে জমির ওপর আপনার ফ্ল্যাটটি থাকবে ওই স্থানের জমির দলিলপত্রগুলো যাচাই করে নেওয়া ভালো।
- ঋণের জন্য ফ্ল্যাটটি কোনো ব্যাংকের কাছে বন্ধক আছে কি না,
- ফ্ল্যাটটি এর আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না ,এছাড়াও
- প্রস্তাবিত ফ্ল্যাটটি সরকারের খাসজমিতে পড়েছে কি না,
- ফ্ল্যাটটির ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের অনুমোদন আছে কি না এ-সংক্রান্ত সনদ দেখে নিতে হবে।
- সব ধরনের চার্জ, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং দায়দায়িত্ব স্পষ্ট করে জেনে নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা না হয়।
৭. ইলেক্ট্রিক্যাল,পানির ও গ্যাস সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হন
বিদ্যুৎও পানির সংযোগ আছে কি না এবং তা থাকলে এ বিদ্যুৎ বিল কি বাণিজ্যিক না আবাসিক, তা যাচাই করে নিতে হবে। ফ্ল্যাটটির ভবনের বিদ্যুৎও পানির সংযোগে নির্ভুলতা যতটা সম্ভব যাচাই করে নেওয়া ভাল।গ্যাস-সংযোগ নেওয়ার কথা থাকলে তা আইনগতভাবে নেওয়া হয়েছে কি না দেখতে হবে। যদিও বর্তমানে নতুন ফ্ল্যাটে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
৮. নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দিন
অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তা কতটুকু তার উপরে অনেকগুলো বিষয় নির্ভর করে। নিরাপত্তা পরিমাপ করার জন্য যেগুলোর উপরে আপনি গুরুত্ব দিবেন -
- ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি মনিটরিং - এর ব্যবস্থা
- নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পেশাদার সিকিউরিটি ফোর্স নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে
- জানালার গ্রিল কতটা শক্তিশালী সেটিও যাচাই করে দেখুন
আপনার মনের মত একটি ফ্ল্যাট, যা আপনি চাচ্ছেন তা হয়ত সব সময় একই রকম থাকবে না। সময়ের সাথে জায়গার-পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তন আসবে। তবে অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকারী পরামর্শ হল ধৈর্য ধরে দেখতে থাকা। যত বেশি অ্যাপার্টমেন্ট আপনি দেখবেন, তত ভাল সিদ্ধান্ত আপনি নিতে পারবেন।